আন্তর্জাতিক নদীরক্ষা দিবস
নদীরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় নদীর সঠিক সংখ্যা জানা গুরুত্বপূর্ণ
গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ হাজার ১৫৬টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ১৪ এপ্রিল। এর আগে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে জনগণের মতামত নেয়া হবে বলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়েছেন। কিন্তু বরাবরের মতো এবারো এ খসড়া তালিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এমন বিতর্কিত তালিকা নিয়ে কি কখনো নদী রক্ষা কার্যক্রমে সফল হওয়া যাবে?
পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার মতো নদীর কোলঘেঁষে এ দেশেও সভ্যতার বিকাশ। সভ্যতার শুরু থেকে এ দেশের জনজীবনের সঙ্গে কীভাবে নদী সর্বদা প্রাসঙ্গিক, তার দেখা মেলে বিভিন্ন ক্ল্যাসিক উপন্যাস, রচনায়। যেমন পদ্মা নদীর মাঝি কিংবা তিতাস একটি নদীর নাম। ‘মাছে-ভাতে বাঙালী’ কিংবদন্তির উৎসারণও এই নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপন থেকে। এর পরও নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে একমতে পৌঁছতে পারেনি কোনো মহল। কারণ হিসেবে দর্শানো হয়েছে পদ্ধতিগত ভুলের কথা। বিশেজ্ঞদের মতে, নদী তালিকাভুক্তিতে গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণের পরিবর্তে মূলত টেবিলওয়ার্কের ভিত্তিতে এসব তালিকা প্রণয়ন করা হয়। সরজমিনে গিয়ে নদী তালিকাভুক্তির কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত নদ-নদী রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলো প্রশংসনীয়; যার মধ্যে নদীর সংখ্যা নিরূপণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আগের চেয়ে তুলনামূলক সমন্বিতভাবে নদীর সংখ্যা নিরূপণের কাজ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, নদী রক্ষা কমিশন ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কাজের নির্দেশ দেয়া হয়। নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের পাশাপাশি সংকটাপন্ন, দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় নদী শনাক্ত করে তা উদ্ধারের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
তবে উদ্যোগগুলো তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন নদীর প্রকৃত সংখ্যা বিতর্কের ঊর্ধ্বে যেতে পারবে। পদ্ধতিগত কারণে কিছু সংখ্যা হেরফের হতে পারে, তবে সরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবেই বিশাল ব্যবধান কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কাম্য তো নয়ই। নদীর সংখ্যা নিরূপণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কী হতে পারে, তা নির্ধারণে প্রয়োজনে সব অংশীজন ও গবেষকদের নিয়ে সংলাপে যেতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে একই বিতর্ক থাকা একটি বিষয় স্পষ্ট করে, সমন্বিতভাবে যতই কাজ করা হোক, কোন পথে এগোতে হবে, সে সিদ্ধান্তও সমন্বিতভাবেই আসা প্রয়োজন, যা নদীর সংখ্যা নিরূপণের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এর আগে দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। প্রায় চার বছর কাজ শেষে ২০২৩ সালের আগস্টে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময়ই নদী গবেষকরা এ সংখ্যা নিয়ে আপত্তি জানান। সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়া তথ্যের মিল ছিল না বলে দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু তা নিয়েও আপত্তি ওঠে বিশেষজ্ঞ মহলে। তবু এসব আপত্তির মুখেই এনআরসিসি সেই তালিকা চূড়ান্ত করে। উল্লেখ্য, এনআরসিসির ওই তালিকাও জেলা প্রশাসকদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছিল।
সম্প্রতি পানি মন্ত্রণালয় নদীর যে খসড়া তালিকা প্রণয়ন করেছে, তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভুক্ত ২০০টি নদ-নদী বাদ পড়েছে। আর ওই তালিকার বাইরে থেকে নদীর নাম নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১৪৮টি। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তালিকার ১৮টি নদ-নদীর নামও বাদ পড়েছে। এসব সংখ্যা একটি বিষয় স্পষ্ট করে, নদী নিয়ে কাজ করা সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেই নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে বড় ধরনের ব্যবধান হয়েছে। অথচ নদীর প্রকৃত সংখ্যা না জানলে কয়েক ধরনের আশঙ্কা থেকেই যায়।
প্রথমত, একটি সঠিক তালিকা তৈরি না হলে নদী ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়। এমনিতেই বেশির ভাগ নদী আজ দখল-দূষণে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। আর কতগুলো পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে তা ঠাহর করা যায় না। কারণ প্রকৃত সংখ্যা আমাদের অজানা। আবার দখল-দূষণে থাকা নদীগুলো পুনরুদ্ধার করতে হলেও প্রকৃত সংখ্যা জানা প্রয়োজন। এজন্য সরজমিনে নদীর উৎপত্তি ও পতিতস্থল দেখা দরকার। সেই সঙ্গে নদীর গতিপথ নিরূপণ করতে হবে। গতিপথ জানার চেষ্টা করলে নদীগুলোর নাব্য সংকটের স্বরূপ জানাও সহজ হবে। একসময় নিয়মিত অনেক জেলা থেকে জেলায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। কিন্তু নাব্য সংকটে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক নৌপথ। নদীর সংখ্যা জানলে বন্ধ হয়ে যাওয়া জলপথে পানিপ্রবাহ ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হতে পারে।
আবার নদীর নাব্য সংকট যতটা না প্রকৃতিসৃষ্ট তার চেয়ে বহুগুণ মানবসৃষ্ট। তাই নদীর প্রকৃত সংখ্যা জানলে কেবল যে ব্যবস্থাপনা সহজ হবে তা নয়, নদী দখলদারদের চিহ্নিত ও শাস্তির আওতায় আনতেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ২০২৩ সালে দেশের নদ-নদী দখলদারের তালিকা তৈরিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৭ হাজার ৩৯৬ নদী দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং ওই তালিকা কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ পায়। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানেই ওই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল। নতুন করে যেহেতু নদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের কাজ চলমান, সেই সঙ্গে ওই তালিকাও পুনরায় তৈরি করা জরুরি। কারণ দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে নদী দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হবে না। এছাড়া দখল-দূষণমমুক্ত করে সেসব নদীতে পুনরায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়া দরকার। নাব্য ফেরাতেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। দেশের সব নদীর পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এছাড়া নদী জলজ সম্পদের আধার। নদীসম্পদের মোট পরিমাণ জানতে হলেও প্রয়োজন নদীর প্রকৃত সংখ্যা জানা। আর ভুলে গেলে চলবে না, নদ-নদী এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে নদীর ওপর নির্ভরশীল।
সহসম্পাদক, বণিক বার্তা