জেমিসন মাতৃসদনের প্রথম সভায় হট্টগোল
সেক্রেটারির হেয়ালিতে হামলার দাবি ইনচার্জের
চট্টগ্রাম জেলা রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত আন্দরকিল্লা জেমিসন মাতৃসদন হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির প্রথম সভা চলাকালে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে বহিরাগতদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের ইনচার্জ আলাউদ্দীন পাটোয়ারী। তাঁর দাবি, সেক্রেটারির হেয়ালি ও কার্যকরী কমিটির কয়েকজন সদস্যের প্রত্যক্ষ মদদে এই হামলা সংঘটিত হয়েছে।
জানা যায়, ১৩ জুলাই বিকেল ৪টায় হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ইমরান বিন ইউনূসের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সভায় উপস্থিত ছিলেন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শাহানা জাফর, বোর্ড মেম্বার ডা. আবু জাফরসহ চট্টগ্রাম জেলা এডহক কমিটির সদস্যরা। হাসপাতাল পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার পর সভা শেষ করে বের হয়ে যান অধ্যাপক ডা. ইমরান বিন ইউনূস এবং ডা. আবু জাফর। এরপরই সভার বিষয়বস্তু লেখার মুহূর্তে একদল ছাত্র বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী পরিচয়ে সভাকক্ষে প্রবেশ করে। এসময় বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনার হাসপাতাল ইনচার্জকে হেনস্তার অভিযোগ এনে তিনি একটি চিঠি পাঠান ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানকে। চিঠিতে তিনি লিখেন, হঠাৎ করে ১৫-২০ জন অজ্ঞাত যুবক কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে জোরপূর্বক রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলে। তিনি আপত্তি জানালে ৪-৫ জন যুবক তাঁর উপর চড়াও হয়, শারীরিকভাবে টানাহেঁচড়া করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পরবর্তীতে তিনি পাশের কক্ষে আশ্রয়ের জন্য সেক্রেটারির রুমে প্রবেশ করেন এবং সাহায্যের জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেক্রেটারি কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকার ভান করেন। এসময় কার্যকরী কমিটির আরও তিন সদস্য হামলা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রেখে বরং হামলাকারীদের সঙ্গে নিরব সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে আলাউদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘আমি এ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তাই প্রতিষ্ঠানের যে কেউ চাইলে আমার বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষকে করতে পারেন। কিন্তু কেউ বাইরের লোকজন নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে, তা ভাবতেই অবাক লাগে। আর যে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই নিয়ম আছে। নিয়মানুযায়ী তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে জানাবে। কর্তৃপক্ষ চাইলে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেদিন যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা সত্যিই দুঃখজনক।
১৪ জুলাই (সোমবার) আলাউদ্দীন পাটোয়ারীর এ চিঠিতে ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান যথাযথ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিডিআরসি চেয়ারম্যানের কাছে সুপারিশ সহকারে প্রেরণ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিডিআরসি বোর্ড মেম্বার ডা. আবু জাফর বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এ হাসপাতালটিতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জড়িত। তাই কারো সংর্কীণতার কারণে হাসপাতালের মিটিং চলাকালে বাইরের লোক এনে এমন ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি লোকাল কমিটিকে সলভ (সমাধান) করতে বলেছি। তারা কি করে দেখি, তারপর সিদ্ধান্ত নেবো।’
আলাউদ্দীন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওইদিন ছেলেরা যখন আসে, তার আগে আমি ও চেয়ারম্যান স্যার বের হয়ে যাই। তার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটি অফিশিয়াল নিয়মে সলভ করা উচিত। এভাবে বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি করাটা উচিত হয়নি। আসলে পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে নতুন কমিটি করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, একেকজনকে একেকজন ভালো বলেছেন। আমরাও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তাদের নিয়েছি। এখন আমরা এক ধরনের যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি বলা যায়। তবে যেভাবে থাকি আর যা করি না কেন, আমরা চাই এ হাসপাতালের সেবার মান আরও বৃদ্ধি হোক। কারণ আমি বরাবরই বলে আসছি, এখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জড়িত।’
উত্তেজনার উটকো সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী শাহনুর
ম্যানেজমেন্ট কমিটির মিটিংয়ের কথা শুনে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে প্রবেশ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আমিরুল ইসলাম শাহনুর। তিনি সরাসরি চেয়ারম্যানের কক্ষে চলে যান। সেখানে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা তাকে দেখে চিহ্নিত করেন। এরপর তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
এ বিষয়ে ভাইস-চেয়ারম্যানের অফিস পিয়ন মো. আমদাদ বলেন, ‘উনার (ভাইস-চেয়ারম্যান) রুমে অনেকেই যায়। একইভাবে ছাত্রলীগ নাকি যুবলীগের কর্মীও সেদিন ওখানে যান। ওই সময় ছাত্ররা এসে আমাদের জিজ্ঞেস করে, উনি জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের উপর হামলা করেন। তখন আমরা তাদের বোঝাই, আমাদের কাজ হলো— বেল চাপলে রুমে গিয়ে স্যারদের আদেশ মানা। আর উনাদের রুমে অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষ যান। কাউকে আমরা বাধা দেই না।'
আটক হওয়া শাহনুর আগেও এসেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'হাসপাতালের পাশের বিল্ডিংটা উনাদের। উনি মাঝেমধ্যে আসতেন। কিন্তু ৫ আগস্টের (২০২৪ সাল) পর থেকে তিনি আর আসেননি। আমাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকায় উনার রাজনৈতিক কোনো পরিচয় আছে কিনা তা আমরা গণ্ডগোলের পরেই জেনেছি। এ সময় আমার স্যারকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। অথচ এসব ঘটনা যখন হচ্ছিলো, তখন তিনি মিটিংয়ে ছিলেন।’
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের হাসপাতালের যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করতে কথা হয় সংগঠনটির জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ ইমন বলেন, ‘রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের ইনচার্জ আলাউদ্দীন পাটোয়ারির দুর্নীতি নিয়ে আমাকে আরও দুই-তিন মাস আগে কয়েকজন জানিয়েছেন। আমি বিষয়টি নিয়ে সেন্ট্রাল কমিটির একজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। এখন আমি এনসিপির দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। তাই গত রবিবার ঘটনায় ছাত্র আন্দোলনের কেউ গেছে কিনা তা আমার জানা নাই।’