বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া মেগা প্রকল্পগুলোর সুবাদে দেশে সিমেন্ট ও ইস্পাতের চাহিদায় উল্লম্ফন ঘটে। বাড়তি এ চাহিদা পূরণে কোম্পানিগুলোও উৎপাদন সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। তবে কভিডের সময় থেকেই ব্যবসায়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে খাত দুটি। এর পর থেকে ডলার সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা, অর্থ সংকটের কারণে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি মেগা প্রকল্পের শ্লথগতি সিমেন্ট ও ইস্পাতের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্বাভাবিক সময়ে এ দুই খাতের উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকত। বর্তমানে তা আরো বেড়েছে। পাশাপাশি সার্বিকভাবে অর্থনীতি ও ব্যবসায় মন্দার প্রভাবে সিমেন্ট ও ইস্পাতের উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই কমেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তিন দশক আগেও দেশের সিমেন্ট খাত ছিল আমদানিনির্ভর। তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বড় অংকের বিনিয়োগের সুবাদে বর্তমানে সিমেন্ট রফতানিকারকের খাতায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। গত এক যুগে এ খাতে তিন গুণের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ভবিষ্যতের চাহিদা মাথায় রেখে উদ্যোক্তারা ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছেন, যদিও এর অর্ধেকই বর্তমানে অব্যবহৃত থাকছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশের সিমেন্ট উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৭ কোটি ৮০ লাখ টন। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। ফলে সক্ষমতার ৪৮ শতাংশই অব্যবহৃত থাকছে। টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং করভার বাড়ার কারণে সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। যদিও তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোম্পানিগুলোর পক্ষে সিমেন্টের দাম খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হয় না। তার ওপর বর্তমানে সিমেন্টের চাহিদায় বড় ধস নামায় এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।
দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে সিমেন্ট খাতে সাতটি ও ইস্পাত খাতের পাঁচটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। সিমেন্ট খাতের তালিকাভুক্ত স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আরামিট সিমেন্ট লিমিটেড, কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসি, ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি, মেঘনা সিমেন্ট মিলস পিএলসি ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি। এছাড়া সিমেন্ট খাতের তালিকাভুক্ত দুই বহুজাতিক কোম্পানি হচ্ছে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ পিএলসি ও লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি। ইস্পাত খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) লিমিটেড, বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম) লিমিটেড ও এসএস স্টিল লিমিটেড।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে সিমেন্ট ও ইস্পাত কোম্পানিগুলোর সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত ছিল। কনফিডেন্স সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা ১২ লাখ টন। যদিও এর ৪৩ শতাংশ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন করেছে কেবল ৫ লাখ ১৭ হাজার ৮২৪ টন। কোম্পানিটির রেডি-মিক্স কারখানার মোট সক্ষমতার মাত্র ৩ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে ওই সময়। গত হিসাব বছরে আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির বিক্রিও কমেছে। চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কমেছে বিক্রি। এদিকে ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানি বিঘ্নিত, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা ও রেডি-মিক্স ব্যবসার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপের প্রভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা কমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সে কারণে গত সেপ্টেম্বরে রেডি-মিক্স কংক্রিট ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কনফিডেন্স সিমেন্ট।
ক্রাউন সিমেন্টের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪৫ লাখ ৩০ হাজার টন। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি সক্ষমতার ৭৭ শতাংশ ব্যবহার করেছে। আগের অর্থবছর ব্যবহার করেছিল ৯৫ শতাংশ। অবশ্য গত হিসাব বছরে কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রির পরিমাণ ও টাকার অংকে আয় বেড়েছে। তবে চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ক্রাউন সিমেন্টের ব্যবসা থেকে আয় ও সিমেন্ট বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে।
জানতে চাইলে ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির প্রধান উপদেষ্টা মাসুদ খান বলেন, ‘২০২৩-২৪ হিসাব বছরের তুলনায় চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে আমাদের সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন আরো কমেছে। চলতি বছর আমাদের নতুন একটি ইউনিট যোগ হয়েছে। পাশাপাশি বিক্রির পরিমাণও কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর হার কমেছে। সরকারের মেগা প্রকল্প, আবাসন ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘর নির্মাণের কাজে মূলত সিমেন্ট ব্যবহার হয়। বর্তমানে মেগা প্রকল্প ও আবাসন খাতে সিমেন্টের চাহিদা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে গেছে। তবে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়ায় মানুষের বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে সিমেন্টের ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে। সামনের বছরেও সিমেন্টের চাহিদা মন্দা থাকবে বলে আমরা মনে করছি।’
মেঘনা সিমেন্টের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৪ লাখ ২০ হাজার টন। এর মধ্যে কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে মাত্র ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে। এ সময়ে আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির বিক্রিও কমেছে। পাশাপাশি চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকেও আগের তুলনায় কোম্পানিটির বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৫৭ লাখ ১২ হাজার টন। এর মধ্যে গত ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি ৫৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রির পরিমাণ ও আয় বেড়েছে। তবে চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রি কমে গেছে। তাছাড়া ২০২৩ হিসাব বছরে তালিকাভুক্ত দুই বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ ৬৭ ও হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস ৬২ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে।
বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা ৪১ লাখ ৯১ হাজার টন। এর মধ্যে ২০২৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটি ৬৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে। গত হিসাব বছরে কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও চলতি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) আয় কমেছে। তালিকাভুক্ত হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে ২০২৩ হিসাব বছরে কোম্পানিটি ৬২ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে। গত হিসাব বছরে কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে আয় কমেছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) ও উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে দেশে ইস্পাত খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে মোট ইস্পাতের উৎপাদন প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ইস্পাতের বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে দেশের ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ লাখ টন। এর মধ্যে ৫০-৫৫ লাখ টন স্থানীয় বাজারে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ইস্পাত রফতানিও হয়। সিমেন্টের মতোই নির্মাণ খাতের মন্দার কারণে ইস্পাতের চাহিদা ও উৎপাদন কমছে।
বিএসআরএম লিমিটেডের মেল্টিং ইউনিটের সক্ষমতা ১৩ লাখ টন। এর মধ্যে কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে ৬৭ শতাংশ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পেরেছে। কোম্পানিটির রোলিং ইউনিটের সক্ষমতা আট লাখ টন। কাজে লাগাতে পেরেছে ১০৮ শতাংশ। বিএসআরএম স্টিলসের মোট উৎপাদন সক্ষমতা আট লাখ টন। ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি সক্ষমতার ১১৩ শতাংশ কাজে লাগিয়েছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিএসআরএম লিমিটেডের বিক্রি কমলেও বিএসআরএম স্টিলসের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে।
জানতে চাইলে বিএসআরএমের কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন কর বলেন, ‘সার্বিকভাবে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা যাচ্ছে। ফলে ইস্পাতের বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। অন্যদিকে ডলারের দাম আবারো বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি সুদহার বেড়ে গেছে। এতে সামনের দিনগুলোয় উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে।’
জিপিএইচ ইস্পাতের এমএস বিলেট উৎপাদন সক্ষমতা ১০ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২৩-২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি কাজে লাগাতে পেরেছে ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। কোম্পানিটির এমএস রড উৎপাদনের সক্ষমতা ৭ লাখ ৯০ হাজার টন। গত হিসাব বছরে ৭১ দশমিক ১৯ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পেরেছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা থেকে আয় কমেছে। অবশ্য চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় কিছুটা বেড়েছে।