বকেয়া ৪ কোটি ডলার নিয়ে দ্বন্দ্ব
পাওনা না মিটিয়ে বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ স্থগিত
সংগৃহীত ছবি
রাশিয়ার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইলের কাছে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতের বকেয়া পাওনা নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রায় চার কোটি মার্কিন ডলারের এই বিশাল পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে পোল্যান্ডের স্বনামধন্য পোশাক ব্র্যান্ড এলপিপি বাংলাদেশে তাদের নতুন ক্রয়াদেশ এবং নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। পাওনা আদায়ে দেশীয় ব্যবসায়ীরা যখন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন, ঠিক তখনই এলপিপি এই চাপ প্রয়োগের কৌশল বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই জটিলতার সূত্রপাত মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর। রাশিয়ায় নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এলপিপি বিকল্প হিসেবে এফইএস রিটেইলকে সামনে আনে। দেশীয় রপ্তানিকারকদের ভাষ্যমতে, এলপিপির ঢাকা কার্যালয় থেকেই এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে দেশের কারখানাগুলোতে ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু হয় এবং সে সময় এলপিপি নিজেই অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু গত বছর থেকে পণ্য সরবরাহের পরও অনেক কারখানা ও বায়িং হাউস তাদের পাওনা বুঝে পাচ্ছে না। আর এখন এলপিপি এই বকেয়ার দায় নিতে পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
পাওনা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী আদালতের দ্বারস্থ হলে গত মাসে বিকেএমইএ ও বিজিবিএর সঙ্গে এলপিপির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতার আগে এলপিপি মামলা প্রত্যাহারের শর্ত জুড়ে দিলে পোশাক খাতের নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর গত ২১ ও ৩০ জুলাই দেশীয় সরবরাহকারী এবং পোশাক খাতের সংগঠনগুলোকে চিঠি দিয়ে এলপিপি জানায়, অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত চলমান বিতর্কে তারা নিজেদের চুক্তিভিত্তিক কোনো পক্ষ বলে মানতে নারাজ। বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যৎ সোর্সিং কৌশল পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত থাকবে এবং এ সময়ে তারা অন্যান্য দেশের উৎপাদন সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
দেশের পোশাক খাতের নেতারা এলপিপির এমন সিদ্ধান্তকে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিজিবিএর সভাপতি আবদুল হামিদ জানান, তাদের সংগঠনের ৯টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫ লাখ ডলারসহ মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় চার কোটি ডলার। তিনি অভিযোগ করেন, এলপিপির কার্যালয় থেকেই এফইএস রিটেইলের নামে ক্রয়াদেশ এবং গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল, অথচ এখন তারা সম্পর্ক অস্বীকার করছে। এলপিপি ৫০ শতাংশ ছাড়ে বকেয়া পরিশোধের যে প্রস্তাব দিয়েছিল তা অবাস্তব, কারণ ব্যাংকের কাছেই ব্যবসায়ীদের ৭৫ শতাংশ দেনা রয়েছে। বছরে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের পোশাক কেনা এই প্রতিষ্ঠানটি বকেয়া না দিতে এখন ধূর্ততার আশ্রয় নিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান এনসা ক্লোথিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল কবির। গত বছরের এপ্রিলে এফইএস রিটেইলের জন্য ৫২ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও অর্থ না পাওয়ায় তা রাশিয়ার বন্দরে পড়ে আছে বলে তিনি জানান। বাধ্য হয়ে তারা হাইকোর্টে মামলা করেছেন। তার মতে, এলপিপি গত এপ্রিলের পর এফইএসের সাথে সম্পর্ক নেই বলে দাবি করলেও এপ্রিল-মে মাসের বিল এলপিপিই পরিশোধ করেছিল। দ্রুত অর্থ না পেলে তার সরবরাহকারী কারখানাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সার্বিক এই পরিস্থিতিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্ট জানিয়েছেন, বকেয়া পরিশোধ না করলে এলপিপিকে কালোতালিকাভুক্ত করা হবে। এলপিপি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার যে হুমকি দিচ্ছে, তাতে তারা ভীত নন। পাওনা না মেটালে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সব ফোরামে এলপিপির এই অনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হবে। এছাড়া শুধু এফইএস রিটেইল নয়, এলপিপি নিজেও সরাসরি পণ্য নিয়ে অর্থ দিচ্ছে না বলে তাদের কাছে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।