ফ্ল্যাট কেনা নাকি অন্য খাতে বিনিয়োগ, সিদ্ধান্তের আগে যে হিসাব জরুরি

BD REPORT
বিডি-রিপোর্ট 27 Oct 2026 07:10 am
ফ্ল্যাট কেনা নাকি অন্য খাতে বিনিয়োগ, সিদ্ধান্তের আগে যে হিসাব জরুরি

সংগৃহীত

নিজের একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। তবে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার আগে আর্থিক দিকগুলো ভালোভাবে হিসাব করা জরুরি। কারণ ফ্ল্যাট কেনা মানেই শুধু বাড়িভাড়া সাশ্রয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, কর এবং বিকল্প বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আয়ের হিসাব।

রাজধানীর বছিলায় ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছেন চাকরিজীবী এ কে এম আজহার। বেসরকারি ব্যাংক থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তবে ফ্ল্যাটে ওঠার আগেই প্রতি মাসে ৪৫ হাজার ২৫০ টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে তাঁকে। এর সঙ্গে রয়েছে বর্তমান বাসাভাড়া ও পরিবারের অন্যান্য খরচ। ফলে মাসিক আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে।

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, নিজের বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট কেনা এবং বিনিয়োগ হিসেবে ফ্ল্যাট কেনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বাড়িভাড়া বাঁচানোর হিসাব করলেই হবে না, একই অর্থ অন্য কোথাও বিনিয়োগ করলে কত আয় হতে পারত, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

ধরা যাক, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে প্রয়োজন এক কোটি টাকা। একই ধরনের ফ্ল্যাট ভাড়া ও গ্যারেজভাড়া বাবদ মাসে খরচ ৪০ হাজার টাকা হলে বছরে ভাড়া বাবদ ব্যয় দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু এক কোটি টাকা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করে গড়ে ৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া গেলে বছরে আয় হতে পারে প্রায় ৮ লাখ টাকা। মাসিক হিসাবে যা প্রায় ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা।

অর্থাৎ, ফ্ল্যাট কিনলে একদিকে ভাড়া সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ওই অর্থ বিকল্প বিনিয়োগে ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে না। অর্থনীতিতে এ ধরনের হারানো সম্ভাব্য আয়কে বলা হয় অপরচুনিটি কস্ট বা সুযোগ ব্যয়।

ফ্ল্যাটের দাম ভবিষ্যতে বাড়বে কি না, সেটিও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার অবস্থান, ভবনের বয়স, নির্মাণমান, যোগাযোগব্যবস্থা, নগর উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর ফ্ল্যাটের মূল্য নির্ভর করে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে দাম বাড়বেই, এমন নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে ভাড়া বাসায় থাকলে নিজের মূলধন অন্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকে। জরুরি প্রয়োজনে বিনিয়োগের ধরন পরিবর্তন করাও তুলনামূলক সহজ। তবে ফ্ল্যাট কিনলে বড় অঙ্কের অর্থ একটি সম্পদে আটকে যায়, যা প্রয়োজনের সময় দ্রুত নগদায়ন করা কঠিন হতে পারে।

ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে হিসাব আরও জটিল। যেমন, ৫০ লাখ টাকা নিজের সঞ্চয় থেকে দিয়ে আরও ৫০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনলে ঋণের সুদ ও কিস্তি ফ্ল্যাটের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি নিবন্ধন, কর, ফি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও মোট বিনিয়োগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্তে শুধু আর্থিক মুনাফাই বিবেচ্য নয়। নিজের বাড়িতে থাকার নিরাপত্তা, পছন্দমতো পরিবেশ তৈরি, বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্কজনিত ঝামেলা এড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ঠিকানার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের কাছে অবসরজীবনের নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও নিজের বাসার মূল্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফ্ল্যাট কেনার আগে বিকল্প বিনিয়োগের সম্ভাব্য আয়, ঋণের মোট খরচ, ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধি এবং মূলধন আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফ্ল্যাট কেনার পরও পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় হাতে থাকছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

সব মিলিয়ে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।