বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ভবন
দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের শেয়ারবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালু হয়েছে। নতুন বিধিমালার আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এতে উদ্যোক্তা ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন এ উদ্যোগ নিয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন আইপিও না আসায় শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি যুক্ত করা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এর অন্যতম লক্ষ্য। এ-সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে ১৮ অক্টোবর।
যেসব কোম্পানি পাবে সুযোগ
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, সব বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে না। কোম্পানিতে সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে অথবা অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা বিদেশিদের হাতে থাকতে হবে।
এছাড়া অন্তত ৫০০ কোটি টাকার নিট সম্পদ থাকা তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি এ সুযোগ পাবে। বার্ষিক অন্তত এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন বা টার্নওভার রয়েছে—এমন কোম্পানিও সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জ ও ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠানও এ প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হবে।
তালিকাভুক্তির আগে মানতে হবে শর্ত
সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে অন্তত পাঁচ বছর ধরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকতে হবে। সর্বশেষ দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রবাহও ইতিবাচক হতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির কোনো পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা চলবে না।
কোম্পানির উদ্যোক্তা ও শেয়ার বিক্রেতারা ঋণখেলাপি হতে পারবেন না। তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে।
শেয়ারের দাম নির্ধারণ হবে যেভাবে
নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। তবে বিক্রির পরিমাণ মূল পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশের সমপরিমাণ হতে হবে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে মার্চেন্ট ব্যাংকারের পরামর্শ নিতে হবে। কোম্পানির সম্পদ, দায় ও আয় বিবেচনায় শেয়ারের একটি যৌক্তিক বা রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর ঘোষিত সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য ওই রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম রাখতে হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, প্রথম দুই দিন বিনিয়োগকারীরা ঘোষিত সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে শেয়ার কেনার আদেশ দিতে পারবেন না। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতা
দেশের শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তি নিয়ে অতীতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১০ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি ও ওশান কনটেইনারের তালিকাভুক্তিকে ঘিরে প্রশ্ন ওঠে। পরে বেসরকারি কোম্পানির জন্য এ সুযোগ বন্ধ করা হয়।
২০১৪ সালে আমান সিমেন্ট এবং ২০২২ সালে বেস্ট হোল্ডিংস সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বিএসইসি দুটি উদ্যোগই আটকে দেয়। আমান সিমেন্টের ক্ষেত্রে কোম্পানির উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ারের উচ্চমূল্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
আইপিওশূন্য বাজারে নতুন সম্ভাবনা
দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন আইপিও না আসায় শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি যুক্ত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নতুন বিধিমালার ফলে বড় ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে উৎসাহিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির নতুন মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু উদ্যোক্তারা বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করতে চান, তাদের জন্য এটি বিকল্প পথ তৈরি করবে।
তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের ওপর। কোম্পানির আর্থিক তথ্য যাচাই, শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধরে রাখার শর্ত যথাযথভাবে তদারক করতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে নতুন তালিকাভুক্তির সুযোগ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হতে পারে।