কৃষিঋণে কমছে কৃষির অংশ, বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ
সংগৃহীত
গ্রামীণ ঋণগ্রহীতাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এক বছরে আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করেন এমন ঋণগ্রহীতার হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে এ হার ৭৯ শতাংশ। কিস্তি ও জরুরি খরচ মেটাতে অনেক পরিবারকে আবারও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন: প্রমাণ ও নীতিসংলাপ’ শীর্ষক কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।
গবেষণা অনুযায়ী, গত এক বছরে ঋণ নেওয়া গ্রামীণ পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে, মোট গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। গ্রামীণ ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে।
এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে একই সঙ্গে মহাজনের কাছ থেকেও ঋণ নেওয়ার হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে। ফলে একটি ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারগুলো আরও ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন শুধু ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃষকের আয় ও উৎপাদন মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের কিস্তি নির্ধারণ করা জরুরি।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন পর্যায়ে ঋণ দিলেই হবে না; সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপেও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উৎপাদন খরচ কমানো ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি এবং কার্যকর অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. একে এনামুল হক বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থায়নে ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা না গেলে কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে এবং অনেকে কৃষি ছেড়ে দিতে পারেন।
ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ক্ষুদ্রঋণ খাতের অর্থায়ন ও সেবামূল্য পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনা অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ খাতের সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ২০০৬ সালের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ সেবামূল্য ২৪ শতাংশ। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বেশি সঞ্চয় সংগ্রহ করতে পারলে অর্থায়নের খরচ ও সেবামূল্য কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান কৃষির যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ২ শতাংশেরও কম কৃষক পরিবারের নিজস্ব ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার রয়েছে। কৃষিযন্ত্র কেনার অর্থের মাত্র ২ থেকে ৭ শতাংশ ব্যাংক থেকে আসে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাকে যন্ত্র বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিস্তিতে যন্ত্র কিনতে হয়।
কৃষিযন্ত্রের আয় মৌসুমনির্ভর হওয়ায় ধান কাটার মৌসুমে, বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে, আয়ের বড় অংশ আসে। কিন্তু মাসিক কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতায় বছরের অন্য সময়ে অর্থসংকট তৈরি হয়।
গবেষণায় গবাদিপশু খাতেও অর্থায়নের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। দেশের কৃষি জিডিপির ৭ দশমিক ৬ শতাংশ আসে এ খাত থেকে এবং গবাদিপশুর ৯০ শতাংশ মালিক ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ কৃষিঋণের ৫ শতাংশেরও কম এ খাতে যায়। গবেষণায় গরু মোটাতাজাকরণে ছয় মাসে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মুনাফার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মশালার আলোচকেরা মনে করেন, কৃষকের আয় ও উৎপাদন মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিস্তি, কৃষিযন্ত্র কেনায় সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ঋণ পরিশোধে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হলে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ ও উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়। তাই শুধু ঋণের প্রবাহ বাড়ানো নয়, ঋণের শর্ত ও অর্থায়নের কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।