অর্থনীতিতে বড় শঙ্কা, ৩.৪% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুষ্ঠান
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। এসব চাপে চলতি অর্থবছর ও আগামী অর্থবছর—দুই বছরই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারে প্রবৃদ্ধি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় বাধা হয়ে উঠেছে জ্বালানি খাতের সংকট। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের নিম্ন হার অর্থনীতির গতি আরও কমিয়ে দিচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
অন্যদিকে, বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, এই স্থিতিশীলতা টেকসই করতে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক ধীরগতির প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রাতেও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থেমে গেছে এবং নারীরা তুলনামূলক বেশি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ ও সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই বিদ্যমান সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক খাদ্য ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করা, সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সম্প্রসারণ এবং নগদ সহায়তা আরও কার্যকরভাবে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সরকারি-বেসরকারি সেবা উন্নত করা এবং রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষতা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় নীতিগত কাঠামোর উন্নয়ন জরুরি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।