যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হঠাৎ সরব মোদি সরকার, নেপথ্যে ৩ ইস্যু

BD REPORT
বিডি-রিপোর্ট 28 Oct 2026 09:10 pm
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হঠাৎ সরব মোদি সরকার, নেপথ্যে ৩ ইস্যু

সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে এবার প্রকাশ্যেই ওয়াশিংটনের সমালোচনা করছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা এবং বাণিজ্যনীতির কারণে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া উত্তেজনার মধ্যেই ভারতের এই অবস্থান পরিবর্তন। এত দিন কূটনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশ্যে না এনে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও এখন ওয়াশিংটনের প্রতি নয়াদিল্লির সমালোচনামূলক অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট সংবেদনশীলতা নেই। পাশাপাশি ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আত্মকেন্দ্রিক বাণিজ্যনীতিও বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বুধবার (৩০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই ফোনালাপকে ‘ফলপ্রসূ’ বললেও মোদির বক্তব্যে আগের মতো উষ্ণতা ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্য নিয়ে বাড়ছে দূরত্ব

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। তবে বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৫ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার।

দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। কৃষি খাত নিয়ে মতপার্থক্য এর অন্যতম কারণ। কৃষকদের সুরক্ষায় ভারত কয়েক দশক ধরে নিজেদের বাজার অনেকটাই সীমিত রেখেছে।

জয়শঙ্কর বলেন, দুই দেশের মাথাপিছু আয়, উৎপাদনব্যবস্থা ও সমাজের ধরনে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়েছে।

এদিকে, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে একটি আইনে সই করেছেন ট্রাম্প। এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

পাকিস্তান নিয়ে ভারতের অসন্তোষ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আরেকটি বড় অস্বস্তির জায়গা পাকিস্তান। গত বছরের মে মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাত হয়।

পরে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে দাবি করেন, তাঁর হস্তক্ষেপেই দুই দেশের লড়াই বন্ধ হয়েছে। তবে কাশ্মীর ইস্যুকে ভারত বরাবরই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। এতে তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা তারা গ্রহণ করে না।

ট্রাম্পের বারবার যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির অসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

জয়শঙ্কর বলেন, কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসবাদের শিকার হওয়া ভারতের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের এই উদ্বেগ যথাযথভাবে উপলব্ধি না করা হলে তা দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করবে।

দেশের ভেতরেও চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি ও এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে পরিবর্তনও ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই কর্মসূচির বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি ভারত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বিধিনিষেধ ও ফি বৃদ্ধির কারণে ভারতীয় কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভারতের অবস্থান পরিবর্তনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কাছে ভারত বারবার নতি স্বীকার করছে—এমন অভিযোগ বিরোধী দলগুলো তুলছে। আগামী বছর ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন থাকায় এ বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগ বাজপেয়ির মতে, জয়শঙ্করের বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতার একটি খোলামেলা মূল্যায়ন উঠে এসেছে। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ভারত দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী থাকলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।

অন্যদিকে, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত মনে করেন, ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর কারণে নয়াদিল্লি এখন নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, বর্তমান টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশ সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি হলে সম্পর্কের উন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।