ছাদে সোলার, গ্রিডে বিদ্যুৎ দিলে মিলবে সাড়ে ১০ টাকা

BD REPORT
বিডি রিপোর্ট 27 Oct 2026 05:10 am
ছাদে সোলার, গ্রিডে বিদ্যুৎ দিলে মিলবে সাড়ে ১০ টাকা

সংগৃহীত ছবি

তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। একই সময়ে গ্যাস সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। রান্নার গ্যাস না থাকায় রাইস কুকার, ইন্ডাকশন ও বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বাড়ায় বাসাবাড়িতেও বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ায় আবাসিক এলাকায় বাড়ছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় ধরনের প্রণোদনা দিয়েছে সরকার।

বাড়ি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি গ্রাহকের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট মূল্যে কেনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. খালেকুজ্জামান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

যেভাবে মিলবে ১০ টাকা ৫০ পয়সা

নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে গ্রাহক তার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপিত যোগ্য সিস্টেম থেকে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ পরিশোধ করা হবে।

তবে আগে থেকে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। প্রণোদনার আওতায় আসতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মিটারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে।

সরকারের হিসাবে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান ব্যয় ও বাজারদর বিবেচনায় এ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

গ্রাহক যে পরিমাণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তার হিসাব সংরক্ষণ করবে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থা। পরে নির্ধারিত অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।

দিনের বিদ্যুৎ যাবে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে

সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন দিনের বেলায় বেশি হলেও বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়ে সন্ধ্যার দিকে। ফলে দিনের উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরো সুবিধা পিক আওয়ারে পাওয়া যায় না।

নতুন ব্যবস্থায় ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করায় এ সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৯৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কিনছে। তবে এসব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। নতুন উদ্যোগে তাই ব্যাটারি সংযুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও। রান্নার গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে রাইস কুকার, ইন্ডাকশন চুলা ও ইলেকট্রিক কুকার ব্যবহার করছে। এতে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এ চাহিদা আরও বাড়ছে।

পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্যাস সংকটে রান্না করা না গেলে মানুষ বিকল্প হিসেবে রাইস কুকার, ইন্ডাকশন চুলা বা ইলেকট্রিক কুকার ব্যবহার করে। এতে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। একটি এলাকায় আগে যেখানে ৫ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়লে তা ৬ মেগাওয়াটে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদনে চাপ তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি এখন একটি চক্রের মতো হয়ে গেছে। তবে সরকার নতুন নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা যায়।

শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার, আবাসিকে সমন্বয়

চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।

এ কারণে শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী লোডশেডিং সমন্বয় করা হচ্ছে।

উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ও চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক চাপও বাড়ছে। পিডিবি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করে।

পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০০৮ সালের তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন দুটিই বেড়েছে।

তিনি বলেন, গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯ টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন ও ক্রয় ব্যয়ের সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের প্রায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা খরচ হচ্ছে। ফলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত ঘাটতি সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে দিতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।