পুরান ঢাকায় একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরও কমছে না ঝুঁকি। আবাসিক ভবন, দোকান ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিপুলসংখ্যক রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম থাকায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সুপারিশ দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণহানি এড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ সোমবার (১২ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারের মনজুর খান প্লাজার একটি দোকানে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভবনের ভেতরে প্লাস্টিক ও দাহ্য পদার্থের মজুত, সরু গলি, ঘন ধোঁয়া এবং পানির সংকটের কারণে আগুন নেভাতে দীর্ঘ সময় লাগে।
নিমতলী-চুড়িহাট্টার পরও বদলায়নি পরিস্থিতি
২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টার আগুনে ৭১ জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি সেই উদ্যোগ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, প্রায় ১৫ হাজার গুদাম আবাসিক ভবনের ভেতরে অবস্থিত। ফলে এসব ভবনে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আবাসিক ভবনের নিচেই দাহ্য রাসায়নিক
আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকান ও গুদামে প্লাস্টিকের কাঁচামাল এবং নানা ধরনের রাসায়নিক মজুত রাখা হয়। কোনো কোনো ভবনের নিচতলায় এসব গুদাম থাকলেও ওপরের তলাগুলোতে রয়েছে আবাসিক বাসা। কোথাও আবার দোকানের ওপর দিয়ে ঝুলে আছে এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার।
গুদামগুলোতে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, থিনার ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো রাসায়নিক রাখা হয়। এসব পদার্থের কিছু আগুনের সংস্পর্শে এলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়া বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ
ঝুঁকি কমাতে ফায়ার সার্ভিস রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম আবাসিক এলাকা থেকে নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া, ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড মানা এবং জরুরি বহির্গমন পথ সচল রাখার সুপারিশ করেছে।
পাশাপাশি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন, প্রধান সড়ক ও মার্কেটের পাশে ফায়ার হাইড্রেন্ট তৈরি, প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং সরু গলিতে দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম ছোট অগ্নিনির্বাপণ ইউনিট বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পুরোনো বৈদ্যুতিক তার ও গ্যাসলাইন নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, চকবাজারের আগুনের ভয়াবহতার অন্যতম কারণ ছিল মজুত করা প্লাস্টিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ। সরু গলি, ঘন ধোঁয়া এবং পানির অভাবের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
তিনি জানান, পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে ফায়ার সার্ভিসের বিস্তারিত সুপারিশ ছিল। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত সহযোগিতা ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চকবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট রাসায়নিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলা হলেও তাঁরা এখনো তা বুঝে পাননি। তাঁর মতে, পরিকল্পিত এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা স্থানান্তর করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিছু স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো থমকে আছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি কমাতে শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালালেই হবে না; ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম সরানো, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পানির ব্যবস্থা উন্নত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।