ধর্ষণ-হত্যা-চাঁদাবাজি থামছে না; অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি কোথায়?
সম্পাদিত ছবি
দেশজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও সরকারের নানা উদ্যোগের পরও অপরাধ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় পুলিশের সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এক নারীকে হত্যার অভিযোগ, গাজীপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে কুপিয়ে হত্যা এবং কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অটোরিকশাচালককে হত্যার পর গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তিন মাসের পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ১৩৭টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২৫৩ জন ধর্ষণের শিকার, যাঁদের ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যার তথ্যও দিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে পারিবারিক সহিংসতায় ১৩৭ নারী নিহত এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৮৯ শিশুর প্রাণহানির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিন মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০২টি মরদেহ উদ্ধারের হিসাবও দিয়েছে এইচআরএসএস। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মনে করেন, এসব ঘটনা মোকাবিলায় সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ জরুরি।
সরকারের উদ্যোগ, পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করা এবং সেখানে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
তবে দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের ওপর ছিনতাইকারীদের হামলার ঘটনা পুলিশের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
১৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আগের শাসনামলে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রভাব এখনও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। অপরাধীরা পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানও জানিয়েছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।
আইনের সমান প্রয়োগ জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁর মতে, প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি হয়। এক ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য ঘটনায় রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে শিথিলতা দেখানো হলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের বাধা চিহ্নিত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়ানো এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।