মাদক নিয়ন্ত্রণ করবে কে, যখন পুলিশের সদস্যরাই জড়াচ্ছেন কারবারে?

BD REPORT
বিডি-রিপোর্ট 29 Oct 2026 02:10 am
মাদক নিয়ন্ত্রণ করবে কে, যখন পুলিশের সদস্যরাই জড়াচ্ছেন কারবারে?

সংগৃহীত

মাদক নির্মূলের দায়িত্বে থাকা পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, পরিবহন ও কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকসহ পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। ডোপ টেস্টে মাদক শনাক্ত হওয়ায় সাময়িক বরখাস্তও হয়েছেন কয়েকজন। এসব ঘটনায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা, রংপুর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নাটোর, বগুড়া, বরিশাল ও কিশোরগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও মাদক পরিবহন ও বিক্রির অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কোথাও মাদক সেবনের আসরে আটক হয়েছেন তাঁরা।

বিভিন্ন এলাকায় মাদকসহ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর রংপুর নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ১৯টি ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ জেলা পুলিশের কনস্টেবল মিঠুন ইসলাম ও সাবেক কনস্টেবল ওমর আলীকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপসহ দুই কনস্টেবল মোস্তাইন বিল্লাহ ও নাজমুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএনের সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি।

চট্টগ্রামে গত ৫ মে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার সময় খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। এর চার দিন আগে রামুতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ ৮ এপিবিএনের কনস্টেবল সজিব ব্যাপারীকে আটক করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট লোহাগাড়ায় ১০ হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হন।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুরে ১ হাজার ৭৯০টি ইয়াবাসহ কনস্টেবল মো. রেজাউল করিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতের আলামত নিষ্পত্তি ও মাদক ধ্বংসসংক্রান্ত শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। তবে আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার হয়নি।

২৪ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণখানে মাদক কারবারের অভিযোগে পল্লবী থানার এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী ওয়াসিম গ্রেপ্তার হন। পুলিশ জানায়, তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৫ হাজার ৩৬০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া ২৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুরে ১০৬টি ইয়াবাসহ রাজশাহী রেঞ্জের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল আল আমিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ মে বগুড়ায় ৩০০টি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সদস্য সাইদুর রহমান ও চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য আব্দুল ওয়াহাব।

গত ৮ অক্টোবর বরিশালের দক্ষিণ কড়াপুরে মাদক সেবনের আসরে অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দর থানার এএসআই দেলোয়ার হোসেনসহ চারজনকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ঘটনাস্থলে মাদক সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও মাদক পাওয়া যায়নি। পরে দেলোয়ারকে সাময়িক বরখাস্ত করার তথ্য পাওয়া যায়।

ডোপ টেস্টে শনাক্ত ১২৬, চাকরি গেছে ১১৬ জনের

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত ১২৬ জন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। তাঁদের মধ্যে ১১৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। শনাক্ত সদস্যদের মধ্যে ৯৮ জন কনস্টেবল, ১১ জন এসআই, সাতজন এএসআই, আটজন নায়েক, একজন পরিদর্শক ও একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট ছিলেন।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জানান, ২০২৫ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত আরও ১৭ জন সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গত সেপ্টেম্বরে পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের চালক কনস্টেবল ওসমান গনির ডোপ টেস্টেও মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। তাঁকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

পুলিশের অবস্থান: মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুলিশের কিছু বিপথগামী সদস্য মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। তবে সবাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'যেকোনো সদস্যের পরীক্ষা ইচ্ছামতো করানো যায় না। কাউকে দৃশ্যত মাদকাসক্ত অবস্থায় না দেখলে পরীক্ষা করানো কঠিন। পরীক্ষার ব্যয় এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও রয়েছে।'

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান বলেন, 'পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে অপরাধে জড়িত কেউ ছাড় পাবেন না। সন্দেহ হলে নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো হচ্ছে।' আগামী এক-দুই বছরে ডোপ টেস্টের পরিধি আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানোর পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, 'মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই এতে জড়িয়ে পড়লে সরকারের উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের নজরদারি, নিয়মিত পরীক্ষা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।'

তিনি আরও বলেন, 'মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংস্থার স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে হবে। অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তির ঝুঁকি বাড়ানো না গেলে কার্যকর ও টেকসই মাদক প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হবে।'