সংগৃহীত
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হবে। প্রয়োজনে ডিসেম্বরে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার প্রস্তুতিও রেখেছে সরকার। এদিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ করতে পারবে না ২৬টি ছাপাখানা—এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ১০টি ছাপাখানার মালিককে ডেকে সতর্ক করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সঠিক মানের সব পাঠ্যবই আমি চাই। যারা দিতে পারবে না তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে পাঠ্যবই ছাপিয়ে আনা হবে। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’
বৈঠকে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান (রুবেল) জানান, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাকি ৫ শতাংশ বই ছাপাতে তিনি বাড়তি সময় চান। তবে মন্ত্রী জানতে চান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে না কেন এবং এর যৌক্তিক কারণ কী। বৈঠকে আরেক ছাপাখানার মালিকের কাছে নিম্নমানের বই পাওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা চান তিনি। ওই মালিক ভবিষ্যতে এমনটি হবে না বলে অঙ্গীকার করেন।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩১ কোটি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। গত বুধবারের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই ছাপানোর কথা থাকলেও বাস্তবে ছাপা হয়েছে ৩০ শতাংশের কম। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে বেশি মুনাফা করার প্রবণতা বই ছাপানোর কাজে বিলম্বের অন্যতম কারণ। শেষ সময়ে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কম থাকায় বইয়ের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
দরপত্রে ২৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ
দৈনিক ইত্তেফাকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস, সিন্ডিকেট করে দর জমা এবং কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র চলাকালে প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানো হয় এবং পরে ঠিকাদারেরা সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগ করে নেন। এতে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একক দরপত্র জমা পড়ে, যা মোট দরপত্রের ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১৩টিতে দুটি করে এবং মাত্র দুটিতে তিনটি করে দরপত্র জমা পড়ে। দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা থাকা সত্ত্বেও দরপত্রে প্রতিযোগিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে দরপত্রসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী মো. জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’-এর এক ব্যবসায়িক অংশীদার এবং একটি ছাপাখানার মালিক দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস ও কাজ ভাগাভাগির প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। ওই পরিবারের চারটি ছাপাখানা ২০২৭ শিক্ষাবর্ষেও সর্বোচ্চ কাজ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দরপত্র প্রকাশের পর প্রাক্কলিত মূল্য নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের পদক্ষেপ আইনবহির্ভূত। তিনি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিন মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান।