সম্পাদিত ছবি
রাজনৈতিক পদ থেকে পদত্যাগ করলেই ফৌজদারি অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাওয়া যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলাদা। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও গেণ্ডারিয়ায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের পর এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
পৃথক দুই ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের দুই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁরা পদত্যাগ করেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে, গেণ্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে লোকজনকে ধাওয়া করার ভিডিও প্রকাশের পর বিতর্কে পড়েন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
তবে দুই ঘটনার ধরন আলাদা। রাড্ডার ঘটনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা হয়েছে। গেণ্ডারিয়ার ঘটনায় মূল প্রশ্ন ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, আত্মরক্ষার দাবি এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত মানা নিয়ে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুই শতাধিক ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁরা নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর ও আটকে রাখেন। পরে ভেকু দিয়ে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও পরীক্ষাগার কক্ষ। লুট করা হয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী।
১৯৭৪ সাল থেকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলায় এক কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এতে দরিদ্র নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হয়েছে।
ঘটনার পর জমি দখলচেষ্টায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আলোচনায় আসে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সমিতির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গেও তিনি জড়িত নন।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। প্রাথমিক এজাহারে মিষ্টির নাম ছিল না।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ অক্টোবর সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মিষ্টি। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। তবে তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এর আগে জানিয়েছিলেন, তদন্তে মিষ্টির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। তিনি দলীয় ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থাকে পৃথক বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করেন।
গেণ্ডারিয়ায় অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক
গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। ভিডিওটি তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
ইশরাকের দাবি, ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি মারমুখী ভঙ্গিতে তাঁর গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে আসায় আত্মরক্ষার্থে তিনি ও তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা লাইসেন্স করা অস্ত্র প্রদর্শন করেন। তাঁর আরও দাবি, পুলিশের সহযোগিতায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয় এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
ঘটনাটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ১৯ অক্টোবর প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন ইশরাক। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দিতে স্থানীয় উপপুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও তা ইচ্ছামতো অস্ত্র প্রদর্শনের অনুমতি দেয় না। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫-এর ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হয়, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
তাই ঘটনার ভিডিও, পরিস্থিতি, আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং লাইসেন্সের শর্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইন সবার জন্য সমান, বলছে পুলিশ
অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আইন সবার জন্য সমান। কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।
ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সম্পর্কে তিনি জানান, আত্মরক্ষার প্রয়োজন বিবেচনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্স দিতে পারেন। তবে এর আগে পুলিশের মতামত নেওয়া হয় এবং লাইসেন্সের সঙ্গে নির্দিষ্ট শর্তও থাকে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা আসে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি। পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে বলেও জানান তিনি।
পদত্যাগ আইনি প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে পদত্যাগ বা সাংগঠনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তবে পদত্যাগ রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাবদিহির অংশ হলেও এটি ফৌজদারি তদন্ত বা আইনি দায় নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না।
তাঁর মতে, অভিযোগের তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, ঘটনার পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতা কেউ ছিলেন কি না এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ ওঠা মানেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কাউকে অযথা হয়রানি করা বা অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও ঠিক নয়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় তদন্তে মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের অগ্রগতিই এখন গুরুত্বপূর্ণ
দুটি ঘটনায় অভিযোগের ধরন ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও মূল প্রশ্ন একই—পদত্যাগের পর তদন্ত কতটা এগোবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
পদত্যাগ রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া। তাই ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক—সবার ক্ষেত্রে একই আইনি মানদণ্ড কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।